সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৬:২৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :

কী তাঁর দূরদৃষ্টি!

রামেন্দু মজুমদার
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২০
  • ১০১ জন দেখেছেন

কবে প্রথম সামনাসামনি দেখেছিলাম বঙ্গবন্ধুকে? ১৯৬৪ সালে ত্রাণকর্তার ভূমিকায় তাঁকে আমার প্রথম দেখা। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, থাকি আমার বড় ভাইয়ের সঙ্গে তেজগাঁও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের স্টাফ কোয়ার্টার্সে। আমাদের বাসার পাশ দিয়েই গেছে রেললাইন। রাতের বেলায় হঠাৎ ট্রেন থেমে যাওয়া, মানুষের আর্তচিৎকার—বুঝতে বাকি রইল না সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ছোবল এখানেও লেগেছে। স্বাভাবিকভাবেই আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। আমাদের আত্মীয় অধ্যাপক অজিত গুহ খবরটা শুনে বঙ্গবন্ধুকে ফোন করে বললেন, ‘আমার এক আত্মীয় পরিবার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে আটকা পড়েছে, তুমি যদি উদ্ধার করে আনতে পার।’ হঠাৎ সকালবেলা দেখি আমাদের ফ্ল্যাটের নিচে একটি জিপ এসে থামল। সেখান থেকে নামলেন আর কেউ নন—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সোজা আমাদের ফ্ল্যাটে এসে বললেন, ‘দুই মিনিটের মধ্যে আপনারা তৈরি হয়ে নিচে গাড়িতে আসুন।’ আমি, আমার দাদা, বৌদি ও আমাদের পিতামহী গিয়ে তাঁর জিপের পেছনে উঠলাম। সামনের সিটে বঙ্গবন্ধু বসে ড্রাইভারকে বললেন, ‘সোজা ৩২ নম্বরে চলো, কোথাও থামবে না।’ যাওয়ার পথে দুই দিকে ছিল বস্তি। সেখান থেকে দু-একটা ঢিল ছোড়া দেখে বুঝলাম কেন তিনি কোথাও না থামার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ৩২ নম্বরে গিয়ে দেখি শহরের আরো কয়েকটি সংখ্যালঘু পরিবারকে তিনি তাঁর নিরাপদ আশ্রয়ে এনে রেখেছেন। বেগম মুজিব পরম যত্নে সবার খাবারদাবারের ব্যবস্থা করছেন। সন্ধ্যাবেলা খবর পেয়ে মুনীর চৌধুরী এসে আমাদের নিয়ে গেলেন। আজকাল নেতাদের মুখে অসাম্প্রদায়িকতার কথা অনেক শুনি। কিন্তু কতজনের জীবনাচরণে আমরা তা প্রত্যক্ষ করি? কতজন পারবেন বিপদের মুখে সাহস নিয়ে এগিয়ে যেতে? সেই জন্যই তিনি বঙ্গবন্ধু, আমাদের জাতির পিতা।



পরেরবার তাঁকে আরো কাছ থেকে দেখেছিলাম ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি। আমি মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে বঙ্গবন্ধুর বত্তৃদ্ধতা-বিবৃতির একটি ইংরেজি সংকলন করেছিলাম ‘বাংলাদেশ মাই বাংলাদেশ’ শিরোনামে। সেটা দিল্লি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। তার কপি তাঁকে উপহার দিতে গেছি তাঁর তখনকার অফিস পুরনো গণভবনে। ঘরে তখন শুধু ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। বঙ্গবন্ধু বইটি দেখে খুশি হলেন, আমার একটি কপিতে স্বাক্ষর করে দিলেন, যা আজও আমার সংগ্রহের এক মূল্যবান সম্পদ। আমাকে বললেন বইটা বাংলায় করতে। বাংলা ভাষ্য করলাম ঠিকই, কিন্তু তাঁকে আর দেখাতে পারলাম না।
পরের দেখা ১৯৭৪ সালের বন্যার পটভূমিকায়। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে সবাই অর্থ প্রদান করছে। আমরা থিয়েটার থেকে ‘এখন দুঃসময়’ নাটক করে দুই বা তিন হাজার টাকা সংগ্রহ করে সংকোচের সঙ্গে তাঁর হাতে তুলে দিলাম। তিনি সবাইকে বললেন, ‘দেখ আমার নাটকের ছেলে-মেয়েরাও টাকা নিয়ে এসেছে।’ আমাদের জিজ্ঞেস করলেন আমাদের অফিসের প্রয়োজন আছে কি না। সে সময়ে এত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রয়োজন ছিল যে আমরা বললাম—না, এখন দরকার নেই। তাঁর দূরদৃষ্টির সামনে কী মূর্খ ছিলাম আমরা। আজও নিজস্ব একটি কার্যালয়ের জন্য পথে পথে ঘুরছি।

সর্বশেষ দেখা ১৯৭৫ সালের মে মাসে। বঙ্গবন্ধু গেছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের রামপুরা নতুন ভবন পরিদর্শনে। অভ্যর্থনাকারীদের মাঝে তরুণ প্রযোজক আবদুল্লাহ আল মামুনকে দুই গালে হাত দিয়ে আদর করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের নাটক কেমন চলছে?’ মামুনের জবাব, ‘আপনি তো নাটক বন্ধ করে দিয়েছেন।’ পরে শুনলেন সেন্সরশিপ আর প্রমোদকরের কড়াকড়িতে মঞ্চনাটক বন্ধ হওয়ার কথা। অর্থমন্ত্রীকে বললেন, ‘মল্লিক সাহেব, নাটকের লোকদের টাকা ছাড়া আমার সরকার চলবে না?’ পরদিন তাঁর সঙ্গে দেখা করার কথা বললেন মামুনকে। যথারীতি মামুন আর আমি বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সচিব আমাদের বন্ধু ফরাসউদ্দিনের কাছে গিয়ে হাজির। বঙ্গবন্ধু ফরাস ভাইকে বললেন, ‘রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি করে দাও—এখন থেকে শৌখিন নাট্যগোষ্ঠীদের কোনো প্রমোদকর দিতে হবে না, আর সেন্সরশিপ সহজতর করা হবে।’ বাকিটা আমাদের নাটকের গৌরবের ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০০ সালে শতাব্দীপ্রাচীন কালাকানুন সেন্সরশিপ আইন পুরোটাই বাতিল করে দিলেন।


বঙ্গবন্ধুর কথা মনে হলেই স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে এই সব উজ্জ্বল ছবি। জন্মশতবর্ষে বঙ্গবন্ধুকে অনন্ত শ্রদ্ধা।
লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাম্মানিক সভাপতি, ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট (আইটিআই)

সামাজিক যোগাযোগে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আর নিউজ দেখুন
© All rights reserved 2015- 2020 thepeoplesnews24

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্যমন্ত্রনালয়ের নিয়ম মেনে নিবন্ধনের আবেদন কৃত।

Design & Developed By: Limon Kabir
freelancerzone