শনিবার, ২৩শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং, সকাল ৮:১৫
রিপোর্টারের নাম
  • আপডেটের সময়ঃ November, 7, 2019, 9:40 am
  • 65 বার দেখা হয়েছে

মারিয়া সালামঃ

কাল রাত থেকেই একটা ছবি ঘুরে ফিরে আমার নিউজ ফিডে আসছে। সেখানে মিথিলার সাথে আরেকটি `কম পরিচিত` সেলিব্রিটি পুরুষকে ঘনিষ্ঠ ভাবে দেখা যাচ্ছে। বিষয়টা এতই হালকা আর অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে আমার কাছে, এটা নিয়ে লেখার বা ভাবার কোনও আগ্রহই বোধ করিনি। একটা পোস্টে চোখ আটকে গেল বিকালের দিকে। একজন লিখেছে এটা মিথিলার ব্যক্তিগত বিষয় তবে সে একজন মা, এটা তার মনে রাখা উচিত ছিল। আমি লেখাটার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম, কারণ এতক্ষণ পুরা বিষয়টা তুচ্ছ মনে হলেও এইদিকটা আমার কাছে বেশ চমকপ্রদ মনে হলো। মানে, আমার মতো অনেকেই হয়তো ইস্যুটা অপ্রয়োজনীয় বলে এড়িয়ে যাবেন। কিন্তু `মিথিলা একজন মা` এই জায়গাটা একবার তৈরি করা গেলে, যারা এতক্ষণ এড়িয়ে যাচ্ছিল, তারাও এখানে যুক্ত হবার একটা উপলক্ষ্য পেয়ে যাবেন। তারাও বলবেন, হ্যাঁ, ওর আগে বাচ্চার কথা ভাবা উচিত ছিল। তারপরে, মিথিলাকে আরো নিচে নামিয়ে আনা শুরু হবে। কারণ, সমাজ একজন অভিনেত্রীর যৌন জীবনের গোপনীয়তা দেখতে যতটাই অভ্যস্ত, একজন মায়ের ক্ষেত্রে ততটাই অনভ্যস্ত বা অসহিষ্ণু। তারমানে এই না যে, আমি মিথিলার পক্ষে সাফাই গাইছি বা সে যা করেছে তাকে সমর্থন করছি।

আসলে পুরা বিষয়টা না জেনেই কেবলমাত্র একটা ছবি দেখে মানুষকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করার চেয়েও আমার আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। আমি যেটা বলতে চাইছি তা হলো, একজন মানুষ কি করবে বা করবে না সেটা একান্তই তার ব্যক্তিগত বিষয়। সে যদি তার একান্ত মুহূর্তের ছবি তুলে রাখে, সেটাও তার ব্যক্তিগত বিষয়। তারজন্য যদি তাকে সামাজিকভাবে হেয় হতে হয়, সেটাও তার একান্ত ব্যক্তিগত সমস্যা। সেখানে, আপনার বা আমার মোড়ল হয়ে বা অতি উৎসাহী হয়ে উলম্ফন করাটা চরম হাস্যকর ব্যাপার। মিথিলা যদি পরকীয়াতে জড়িয়ে যায়, সেখানে আপনার সমস্যা কি? সমস্যা হলে হবে সেই ফাহমির স্ত্রীর। কিন্তু তারচেয়েও বেশি হাস্যকর বিষয় হলো, আপনার জায়গায় দাঁড়িয়ে তার সন্তানের জন্য চিন্তা করা। মিথিলার সন্তানের ভালোমন্দ কি তার চেয়ে আপনি বেশি ভালো বুঝবেন? সে তার সন্তানের কথা ভেবে কি করবে আর কি করবে না সেটা কি আপনি তাকে জ্ঞান দেয়ার এখতিয়ার রাখেন? ধর্ম নিয়ে আমি তেমন আলাপ করি না, বিষয়টা খুব অপরিপক্ব মনে হয়।

এইটুকু মানুষ আমরা, এত ক্ষুদ্র আমাদের জ্ঞান, তা দিয়ে ঐশ্বরিক বিষয়ে জ্ঞান ফলানো আমার কাছে চরম ধৃষ্টতা ছাড়া কিছুই না। আমি আমার কাছের মানুষদেরই বুঝতে পারি না ঠিকঠাক মতো, তাদের মনের খবর পড়তেই শিখিনি এখনও। ঈশ্বরের মনের গভীরতা মাপার আমি কে? ধর্ম নিয়ে ভাবতে গেলেই নিজেকে আরো তুচ্ছ আর ক্ষুদ্র মনে হয়। তবে এইটুকু বলছি, পৃথিবীর সকল ধর্মই মাকে এমন দেবতার আসনে বসিয়ে দিয়েছে, তাকে আর রক্তমাংসের মানবীর জায়গায় রাখেনি। সকল ধর্মেই মায়েদের যৌন জীবনের উপরে খুব সূক্ষ্মভাবে একটা পর্দা ফেলে দেয়া হয়েছে। মেরীকে বা কুন্তিকে দেয়া হয়েছে কুমারীর রূপ।

এমনকি শিবের স্ত্রী পার্বতীকেও স্বাভাবিক উপায়ে মা হতে দেয়া হয়নি। অথচ সন্তান মানেই একজন নারী আর পুরুষের ভালোবাসার বা শুধুমাত্র মিলনের ফসল। আমরা যখন মায়ের প্রসঙ্গে আসি, তখন আমরাও ভুলে যাই মায়েদেরও ভালোলাগা বা ভালোবাসা থাকতে পারে। আমাদের কাছে মা মানেই সর্বংসহা, পাক পবিত্র দেবি, যে যেকোনো পরিস্থিতিতে সন্তানের কথা ভেবে নিজের চাওয়া পাওয়াকে দমন করে ফেলবে। এমনকি মা যদি বিধবা হন বা তালাক নিয়ে নেন, তারপরেও তাকে সন্তানের জন্য একাকী জীবন পার করে যেতে হবে। একজন মায়ের ভালো মা হতে গেলে সমাজের কাছে তাকে প্রথমেই এই পরীক্ষায় পাশ করতে হবে। একজন মায়ের জন্য আরেক পুরুষকে ভালোবাসা আমাদের জন্য ট্যাবু।

আমরা ভুলে যাই, একজন মা একজন সাধারণ নারী আর একজন নারী একজন মানুষ। তারও চাওয়া পাওয়া থাকতে পারে। তারও ইচ্ছা অনিচ্ছা বা ভালোলাগা ভালোবাসা থাকতে পারে। তারমানে আমি বলছি না, স্বেচ্ছাচার করতে হবে। বা যারা স্বেচ্ছাচার করছেন, তাদেরও সমর্থন দিচ্ছি না। আমি কেবল বলতে চাইছি, যেটা খারাপ সেটা খারাপই। সেখানে নারী বা পুরুষ বলে আলাদাভাবে বিচার করার কিছুই নাই। অন্যায় পিতা করলেও অন্যায়, মাতা করলেও অন্যায়। নারীকে নারীই ভাবুন, আপনার চোখে তার অন্যায় বা ভুল একজন নারীর ভুল বা অন্যায় হিসেবেই দেখুন। নারীকে মাতৃরূপে দেবির আসনে বসিয়ে পূজা করার কিছু নেই। মায়ের দেবিরূপ তাকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার একটি চাতুর্যপূর্ণ কৌশলমাত্র। মায়েরাও মানুষ, তাদের মানুষের মতো করে বাঁচতে দিন।
লেখক: গল্পকার ও গণমাধ্যমকর্মী

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ পড়ুন