শনিবার, ২৮শে মার্চ, ২০২০ ইং, দুপুর ১:৫৭
রিপোর্টারের নাম
  • আপডেটের সময়ঃ মার্চ, ২৩, ২০২০, ৪:০৫ অপরাহ্ণ
  • 26 বার দেখা হয়েছে

বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান ও ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহের প্রধান ইমাম মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ। তিনি ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতকোত্তর পাস করেন। ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে যুদ্ধাপরাধের প্রতিবাদে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইমাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পরিচালক পদ থেকে স্বেচ্ছা অবসরে যান। তিনি জামিয়া বারিধারা, জামিয়া মাদানিয়া ও জামিয়া ইকরাসহ বেশ কয়েকটি মাদ্রাসায় অধ্যাপনার পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মাদ্রাসা, মক্তব ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর জন্ম ১৯৫০ সালে কিশোরগঞ্জ জেলায়। মহামারি চলাকালে ইসলামের বিধিনিষেধ প্রসঙ্গে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি

প্রতিবেদক : করোনাভাইরাসের সংক্রমণে গোটা বিশ্ব স্থবির হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাসকে মহামারি হিসেবে অবহিত করেছে। বাংলাদেশেও ক্রমেই এ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। দুর্যোগ বা মহামারি প্রসঙ্গে ইসলামে কী বলা হয়েছে?

ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : এ ধরনের বিপদ বা মহামারি প্রসঙ্গে ইসলামে বলা হয়েছে, কোনো রকম আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে। এসব ক্ষেত্রে রাসুল (সা.) যে দোয়াটি পড়তেন তার অর্থ হলো- ‘আল্লাহ যা চান তাই হবে, আল্লাহ যা চান না তা হবে না।’ সুতরাং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং আতঙ্কিত না হওয়া আবশ্যক। কারণ আতঙ্ক এমন একটি বিষয়, যা মানুষকে অর্ধেক রোগী বানিয়ে ফেলে। কোনো বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন মানসিক শক্তি। আতঙ্ক মানসিক শক্তিকে বিনষ্ট করে ফেলে। মহামারি বা বিপদকালে ইসলামের প্রথম শিক্ষা আল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং আতঙ্কিত না হওয়া।

প্রতিবেদক :: মহামারি থেকে মুক্ত থাকতে করণীয় বা সতর্কতা প্রসঙ্গে ইসলামে কী নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে?

ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : প্রথমত, ইসলাম কখনও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে নিষেধ করেনি। বরং পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে- ‘তোমরা তোমাদের সতর্কতাকে অবলম্বন কর।’ হাদিসে বলা হয়েছে, উটকে দড়ি দিয়ে বেঁধে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কল কর। সুতরাং আমাদের উচিত হবে, যেসব সতর্কতামূলক ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে-যেমন, পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার করা ইত্যাদি বিষয়ে আমরা যেন তৎপর থাকি। হাদিসে বলা হয়েছে, দান-খয়রাত করা হলে আল্লাহ বিপদ-আপদ দূর করে দেন। তাই আমরা দরিদ্রদের দান করব। বিশেষ করে যেসব এলাকা লকডাউন হচ্ছে, সেখানকার গরিব মানুষ যারা দিন আনে দিন খায়, তারা কীভাবে চলবে? তাদের বিষয়টা আমাদের দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, আল্লাহতায়ালা অনেক সময় বিপদ বা মহামারির মাধ্যমে আমাদের পরীক্ষা করেন। পূর্বেও অনেক জাতিকে আল্লাহ পরীক্ষায় ফেলেছিলেন। আমাদের উচিত নিজেদের গুনাহ মাপের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করা। প্রত্যেকেই নিজ নিজ বাড়িতে তওবা ও দোয়া করতে পারে। হজরত ইউনুসের (আ.) জাতি যখন আজাবের আলামত দেখতে পেল, তখন তারা হজরত ইউনুসের (আ.) সন্ধান করতে লাগল। তারা কোনোভাবে ইউনুসের (আ.) সন্ধান না পেয়ে সবাই একটি মাঠে জমা হয়ে যান। এরপর তারা আল্লাহর কাছে তওবা করেন এবং বিপদ থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনুল কারিমে বলেন, কোনো জাতির ওপর আজাব অবতীর্ণ হওয়ার পর তা তুলে নেওয়া হয়নি, একমাত্র ইউনুসের (আ.) জাতির ওপর থেকে। সুতরাং এ সময়ে আমরা সবাই মিলে নিজেদের বাড়িতে তওবা করতে পারি।

প্রতিবেদক : : মুসলমানদের ওপর করোনাভাইরাস আক্রমণ করবে না, অন্য ধর্মের লোকদের ওপর আজাবস্বরূপ এ ভাইরাস এসেছে- এ ধরনের কিছু গুজব ছড়িয়েছে। আপনি গুজবের বিষয়ে কী বলবেন?

ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : আমাদের বুঝতে হবে, মহামারি সবসময় আজাব নয়, এটা পরীক্ষাও হতে পারে। আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সবার জন্য, বিশেষত মুসলমানদের জন্য সাবধানবাণীও হতে পারে। অতীতে প্লেগ মহামারিতে অনেক সাহাবা কেরামও মৃত্যুবরণ করেছেন। তাহলে তারা কি মুসলমান নন? নাউযুবিল্লাহ! শুধু তাই নয়, এর চিকিৎসা নিয়েও গুজব ছড়ানো হচ্ছে। ইসলামের বক্তব্য হলো, গুজব সাংঘাতিক মিথ্যা একটি বিষয়। বড় ধরনের পাপাচার। আর গুজবের উৎস শয়তান। সুতরাং আমরা অবশ্যই গুজব থেকে নিজেদের রক্ষা করব। ইসলামের নির্দেশনা হলো, যখনই কোনো খবর আসে, প্রথমে তা দায়িত্বশীলদের জানাতে হবে। তারা যদি মনে করেন সেটা প্রচারযোগ্য, তাহলে তারাই তা প্রচার করবেন। ইসলামে খবরের সত্যতা যাচাই করতে বলা হয়েছে। আমাদের উচিত হবে, কোনো তথ্য পেলে তার সত্যতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা। সত্যতা নিশ্চিত না হলে তা প্রচার না করা।

প্রতিবেদক : : করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত থাকতে সতর্কতা অবলম্বন বা গুজব মোকাবিলায় আলেম সমাজের ভূমিকা কী হতে পারে?

ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান। তারা আলেম সমাজকে অনুসরণ করে। আলেমরা মহামারির কারণ, বাঁচার উপায় জানানোর পাশাপাশি মানুষকে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনে উৎসাহিত করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে মসজিদের ইমামদের মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। মুসল্লিদের সাবধান করতে পারেন। এটা তাদের কর্তব্য; কারণ সমাজের মানুষ ইমামদের কথা শুনে থাকেন, তাদের সম্মান করেন।

প্রতিবেদক : : সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে জামাতে নামাজ আদায় স্থগিত করা হয়েছে। এমনকি জুমার নামাজও স্থগিত করা হয়েছে। বাংলাদেশে কী অবস্থা দেখছেন?

ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : সাধারণত সেসব দেশে জামাতে নামাজ আদায় স্থগিত করা হয়েছে, যেখানে করোনার সংক্রমণ অনেক বেশি। ওইসব দেশে সব ধরনের গণজমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অনেক দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। এরপর জামাতে নামাজ আদায় স্থগিত রাখা হয়েছে। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ সেসব দেশের পর্যায়ে পৌঁছেনি। বাংলাদেশে এখনও সব ধরনের বাজার খোলা আছে। জেলখানায় কয়েদিরা একসঙ্গে এক জায়গায় আছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কারখানা চলছে। এসবের চেয়ে মসজিদের পরিবেশ অনেক ভালো। বাজারে তো কোনো শৃঙ্খলা নেই, কাঁচাবাজারের অবস্থা আরও খারাপ। যেদিন থেকে বাজার বন্ধের ঘোষণা হবে বা কয়েদিদের নিরাপত্তার জন্য তাদের আলাদা করা হবে, তখন আমরা বুঝব যে- মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ না পড়ার সময় হয়ে গেছে। তবে যেখানে হোক নামাজ আদায় করতে হবে। আল্লাহ বলেছেন, নামাজ ও ধৈর্যের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। আমাদের নামাজ ও ধৈর্যের মাধ্যমেই এই বিপদ থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে সহযোগিতা চাইতে হবে।

প্রতিবেদক :: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও জুমার নামাজে বেশ জমায়েত হয়। এ ক্ষেত্রে কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থার দরকার আছে কিনা?

ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : আমাদের সবসময় সতর্ক থাকতে হবে। হাত-মুখ সাবান দিয়ে ধুয়ে মসজিদে আসতে হবে। যথাসম্ভব মাস্ক পরিধান করে আসতে হবে। মোসাফা বা মোয়ানাকা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া মসজিদে আসা-যাওয়ার পথে কারও সঙ্গে কথা না বলা বা সামনাসামনি হওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে। সর্বোপরি, মসজিদ পরিচালনায় দায়িত্বরত ব্যক্তিবর্গ এবং ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ মুসল্লিদের নিজের ও অন্যের নিরাপত্তার বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।

প্রতিবেদক : : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসুস্থ ব্যক্তিদের মসজিদে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এটা কতটা ফলপ্রসূ হতে পারে?

ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : প্রধানমন্ত্রী শরিয়তের আলোকেই পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মসজিদে নামাজ চলবে; কিন্তু যারা অসুস্থ তারা মসজিদে আসবেন না। শরিয়তের নির্দেশনাও তেমনি। অসুস্থদের প্রয়োজনে একা একা নামাজ আদায়ের বিধান শরিয়তে রয়েছে। কারণ, অসুস্থ ব্যক্তি মসজিদে গেলে সুস্থ মুসল্লিরাও অসুস্থ হতে পারেন। আর মসজিদে যদি কোনো অসুস্থ ব্যক্তি না যান, তাহলে তেমন সংশয় থাকে না। এ ক্ষেত্রে মুসল্লিদের সচেতন হতে হবে। যারা অসুস্থ তারা নিজে থেকেই মসজিদে আসা থেকে সাময়িক বিরতি দিয়ে বাড়িতে নামাজ আদায় করবেন।

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ পড়ুন