প্রতিযোগিতার পরিবেশ ও বাজার শক্তি

১২ মার্চ, ২০১৯   |   thepeoplesnews24

ফাইল ছবি

সাজ্জাদ আলম খান :
সুষম প্রবৃদ্ধি অর্জনে ভূমিকা রাখে সুষ্ঠু বাজার প্রতিযোগিতা। বাজারে প্রতিযোগিতাবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিলক্ষিত হচ্ছে। অসুস্থ প্রতিযোগিতামূলক এসব কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে কাজ করার কথা বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের। এখনও প্রয়েজনীয় জনবল পায়নি প্রতিষ্ঠানটি। বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েঠে প্রতিষ্ঠানটির সামনে। এগুলো হলো— কমিশনের কার্য পরিচালনায় পারঙ্গম, আগ্রহী ও দক্ষ জনবল সংগ্রহ, কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, ই-কমার্স-ডিজিটাল অর্থনীতি ও এলডিসি গ্রাজুয়েশন। প্রতিযোগিতা নীতির চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে— প্রতিযোগিতা আইনের সঙ্গে দেশের অন্যান্য আইনের সামঞ্জস্যতা, বিভিন্ন খাতভিত্তিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সংঘাত, কমিশনের ক্ষমতায়ন, প্রতিযোগিতাসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞের প্রয়োজনীয়তা ও কমিশনের স্বাধীনতা। তবে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করা, দ্রব্যমূল্যের সঠিক দাম ও জোগান নিশ্চিত করা, সামাজিক কল্যাণ বৃদ্ধি করা ও নতুন উদ্ভাবনে প্রেরণা সৃষ্টি করা সম্ভব। নতুন উদ্যোগ গ্রহণের বাধা দূর করতে না পারলে তরুণ উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত ও নিরাশ হন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে সহায়ক প্রতিযোগিতার কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। 

ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে মুনাফা অর্জন করাটাই স্বাভাবিক। তবে মুনাফা অর্জনের সাথে নৈতিকতার সম্পর্ক রয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত মুনাফার লোভে ওজনে কম দেয়া কিংবা খাদ্য বা ওষুধে ভেজাল মেশানো সমাজ কখনই নৈতিক বলে মনে করেনি। মুনাফা অর্জনের এ পদ্ধতিকে তাই সব সরকারই আইনের মাধ্যমে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে। ধ্রপদী অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ বাজারে ‘অদৃশ্য হাত’ এর উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন। আর এখান থেকেই যতসব অস্থিরতা তৈরি হয়। এই অদৃশ্য হাত রুখতে প্রয়োজন প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা। সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার পরিবেশ না থাকলে বাজার একচ্ছত্র পথে চলতে শুরু করে। প্রতিযোগিতামূলক বাজার বরাবরই ভোক্তার পছন্দের। এতে দাম স্থিতিশীল থাকে। অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের সুযোগও থাকে না। উদ্ভাবনী শক্তির মাধ্যমে নিজ নিজ অবস্থান তৈরি করতে হয়। বাজার ব্যবস্থাকে প্রতিযোগিতামূলক রাখাও বেশ চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। 

১৮৯০ সালে মার্কিন মল্লুকে প্রতিযোগিতা আইন কার্যকর হয়। এই আইন দিয়ে বাজারের একচ্ছত্র ব্যবস্থাপনায় আঘাত করা হয়। পর্যায়ক্রমে এখন ১৪০টি দেশে একই ধরনের আইন তৈরি হয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে উত্পাদক ও ভোক্তা পর্যায়ে সুরক্ষা দেওয়া। ব্যবসা-বাণিজ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইন পাস করে। আর এর চার বছরের মাথায় গঠন করা হয় বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। তবে জনবল সংকটে এটি এখনও সক্রিয় হতে পারেনি। জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। বারোটি পদে মোট ৩৩ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। আগ্রহী বাংলাদেশিরা আবেদন করতে পারেন। আইন বলছে, ষড়যন্ত্রমূলক যোগসাজশ, মনোপলি, জোটবদ্ধতা ইত্যাদির মাধ্যমে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা বন্ধ করতে কাজ করবে এ কমিশন। বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব বিস্তারকারী অনুশীলন নির্মূলে কমিশন থাকবে সজাগ। প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করাও কমিশনের কাজ। 
অভিযোগের ভিত্তিতে অথবা স্বপ্রণোদিতভাবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতাবিরোধী সব চুক্তি, কর্তৃত্বময় অবস্থান এবং অনুশীলনের তদন্ত করতে পারবে কমিশন। এখন প্রশ্ন উঠেছে, কাদের স্বার্থে এ আইনের অধীনে গঠিত কমিশনকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে?  কেন প্রয়োগে শিথিলতা। বিশ্বের অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বলা হয়ে থাকে ভোক্তা কল্যাণে এই আইন। তবে উন্নত বিশ্বেও এই আইন প্রয়োগের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে  যুক্তরাষ্ট্রে অনুসৃত হয় শারম্যান অ্যাক্ট ও ট্রিটি অব রোম। ১৮৯০ সালে প্রণীত শারম্যান অ্যাক্ট মাত্র ৭৬৯ শব্দের। আদালতে এই আইনগুলোর ব্যাখ্যা একেক সময় একেক রকম হতে দেখা গেছে।
১৯৯৩ সালের দিকের কথা। মাইক্রোসফট অবস্থান তখন তুঙ্গে। সমগ্রোত্রী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রাণান্তকর চেষ্টা করছে। মাইক্রোসফটের দৃষ্টি পড়লো ইন্টারনেট ব্রাউজিং এর উপর। সে সময় নেটস্কেট ভালো করছিলো। মাইক্রোসফট অপারেটিং সিস্টেমের সঙ্গে বিনামূল্যে এক্সপ্লোরার জুড়ে দিল। বিনে পয়সায় মিললো এক্সপ্লোরার। এতে অন্যদের বাজার ক্রমে সংকুচিত হতে থাকল। বিষয়টি বুঝতে পেরে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতা কমিশন অনুসন্ধান শুরু করে। দেখলো মাইক্রোসফট চতুরতার সঙ্গে বাকিদের বাজার থেকে হটিয়ে দিতে চায়। ওই কমিশন ব্যবস্থা নিলো। ব্রাউজারের বাজার দেখতে পাচ্ছি এখন।  ভোক্তারা যাতে বুঝতে পারে সক্রিয় আছে বিভিন্ন ধরণের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এতে কিছুটা স্বস্তিও পেতে পারে দেশের মানুষ। এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী সমস্ত ‘গ্রাউন্ড রুলস’ উপেক্ষা করে যাচ্ছেতাই করতে চাইছে। প্রতিযোগিতার পরিবেশ রক্ষা না পেলে একচেটিয়া কারবারিদের হাত থেকে সাধারণ মানুষ রক্ষা পাবে না। মনে রাখা দরকার একচেটিয়া কারবারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে আমাদের পূর্বসূরিরা। 

তাৎপর্যপূর্ণ বাজার ক্ষমতা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। প্রতিযোগিতা কমিশন না পারলেও, এ ব্যাপারে প্রথম পদক্ষেপ নিলো, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন বা বিটিআরসি। এতে একক বাজার হিস্যা, ষড়যন্ত্র কিংবা জোটবদ্ধ ভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণের স্পষ্ট উদ্যোগ খালি চোখে ধরা পড়ছে। বিটিআরসি বলছে, টেলিকমের ক্ষেত্রে গ্রাহক, রাজস্ব ও তরঙ্গ ব্যবহারের দিক থেকে বাজারের ৪০ ভাগেরও বেশি হিস্যা হয়ে গেলে, তাৎপর্যপূর্ণ বাজার ক্ষমতা বা এসএমপি ঘোষণা করা যাবে। এটা শুধু মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানি নয়, বরং টেলিযোগাযোগ খাতের সব প্রতিষ্ঠানের জন্যই প্রয়োগ করতে পারবে বিটিআরসি। এক মার্চ থেকে বিটিআরসির প্রবিধান কার্যকর হবে। এই টেলিকম কোম্পানি আর কোনো স্বতন্ত্র ও একক স্বত্বাধিকার চুক্তি করতে পারবেনা। মাসে কল ড্রপের পরিমাণ হবে সর্বোচ্চ দুই শতাংশ। কোনো মার্কেট কমিউনিকেশনস অর্থাৎ প্রচার করতে পারবেনা। অর্থাৎ অফার বা প্যাকেজের বিজ্ঞাপন দেয়া নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়লো। এসএমএস করে গ্রাহকদের অফার দিতে পারবে না গ্রামীণ ফোন। 

এমএনপি লকিং পিরিয়ড ত্রিশ দিন করতে হবে গ্রামীণফোনকে। এটা এক ধরণের মার্কেট ব্যালেন্স করার উদ্যোগ। এতে টেলিযোগাযোগ খাতে সুশৃঙ্খল, প্রতিযোগিতামূলক ও সবার জন্য সমান হতে পারে। এসএমপি ঘোষণার ক্ষেত্রে গ্রাহক স্বার্থ বা কোয়ালিটি অব সার্ভিসকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ গ্রাহকের সংখ্যা দিন দিন বাড়িয়ে চললেও, গ্রাহক সংখ্যা অনুপাতে বিনিয়াগ যথার্থ নয় বলে মনে হয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে।  টেলিযোগাযোগ খাতে একচ্ছত্র ব্যবসা মূলত এই প্রতিষ্ঠানটির হাতে। গ্রামীণফোনের গ্রাহকসংখ্যা বাজারের ৪৬ ভাগ। রাজস্ব আয়ের দিক থেকেও বাজারের মোট রাজস্বের ৫০ ভাগ এই কোম্পানিটির। তবে তরঙ্গ ব্যবহারের দিক থেকে কোনো কোম্পানিই ৪০ভাগ অতিক্রম করতে পারেনি। বাংলাদেশে এখন মোবাইল ফোনের গ্রাহক সংযোগ আছে ১৫ কোট ৩০ লাখ। প্রবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের পর থেকে তারা ব্র্যান্ডিং করতে পারবে তবে কোনো মাধ্যমে কোনো ধরনের মার্কেটিং কমিউনিকেশনস চালাতে পারবেনা। এসএমপি ঘোষণার বিরূপ প্রভাব যেনো বিদেশি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। দেশে প্রতিযোগিতা আইনটি গত ছয় বছরে অন্যান্য ক্ষেত্রে কার্যকর করা হয়নি।

 প্রথমবারের মতো বিটিআরসি টেলিযোগাযোগ খাতে এসএমপি ঘোষণা করে প্রতিযোগিতা আইন প্রয়োগের বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।  ইউরোপের দেশগুলোতে এসএমপি ঘোষণার নজির থাকলেও দক্ষিণ এশিয়া এবং এশিয়ার অন্য কোনো দেশে এমনটা দেখা যায়নি। ভারতের প্রতিযোগিতা আইনে কোনো কোম্পানি ৫০ শতাংশ মার্কেট শেয়ার অর্জন করলে সেই কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার বিধান রাখা হয়েছে। তবে সেখানে এখন পর্যন্ত কোনো কোম্পানিকে এসএমপি ঘোষণার নজির নেই।
টেলিযোগাযোগ খাতের বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি ফাইভজির বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরুতে জোর দিচ্ছে। 

এসব প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ ও একীভূতকরণের পাশাপাশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে টেলিযোগাযোগ শিল্প খাতের বিনিয়োগকারীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। গ্লোবাল মোবাইল ব্রডব্যান্ড ফোরামের তথ্যমতে, বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশের নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের উচিত টেলিযোগাযোগ খাতে বিনিয়োগের সঠিক পরিবেশ সৃষ্টি করা। কারণ আগামী দুই বছরে অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলার মূলধন বিনিয়োগের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলো। ভবিষ্যৎ ইন্টেলিজেন্ট কানেক্টিভিটির জন্য বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সৃজনশীল উদ্ভাবনকে অনুপ্রাণিত করতে টেলিযোগাযোগ খাতের জন্য প্রয়োজন সহায়ক নিয়ন্ত্রণ পরিবেশ। টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আলাদা বিবেচনা না করে ডিজিটাল সেবা সরবরাহকারী সব প্রতিষ্ঠানের জন্য একই ধরনের নীতিমালা প্রয়োজন। বিশ্বের অনেক দেশ টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে স্বতন্ত্র নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। বেশকিছু দেশ এ ধরনের নীতিমালা প্রণয়নে কাজ করছে। 
লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক
ই-মেইল: sirajgonjbd@gmail.com






নামাজের সময়সূচি

সোমবার, ২২ জুলাই, ২০১৯
ফজর ৪:২৬
জোহর ১১:৫৬
আসর ৪:৪১
মাগরিব ৬:০৯
ইশা ৭:২০
সূর্যাস্ত : ৬:০৯সূর্যোদয় : ৫:৪৩