"ক্ষমতালিপ্সু জাসদের ক্ষমাহীন ভুল"

০৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯   |   thepeoplesnews24

প্রতিকৃতি

 
 
ব্যারিস্টার এবিএম আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার:
 
বঙ্গবন্ধুর মতো হিমালয়সম ব্যক্তিত্ব ও কিংবদন্তির জনপ্রিয়তা এবং একটি স্বাধীন দেশের প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করে সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিবিপ্লব ঘটানোর প্রচেষ্টার ইতিহাস জাসদের রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে জাতির জনকের হত্যার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করেছিল জাসদ! এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর রাজনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম বলেন, স্বাধীনতার পর দুটি ঘটনা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার দিকে নিয়ে যায়। এর একটি হল- সেনাবাহিনীতে পাকিস্তান ফেরতদের আত্তীকরণ। আরেকটি জাসদ সৃষ্টি। (সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, ১২ নভেম্বর, ২০১৭)।
 
কর্নেল তাহের ও সিরাজুল আলম খানের উদ্দেশ্য ‘বিপ্লব’ প্রকল্পে জনগণের দাবি-দাওয়ার কিছুই ছিল না। ছিল শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সরকারকে উৎখাত করে সামরিক বাহিনীকে গণবাহিনীতে রূপান্তর করা। সেই সাথে মুক্তিযুদ্ধে নবম সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করে জাসদে যোগ দিয়ে সেনাছাউনিগুলোতে সৈনিকদের সংগঠন গড়ে তোলেন। এমনি তিনি ১৭ মার্চ ১৯৭৪, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এম মনসুর আলীর বাড়ির সামনে বিক্ষোভ সমাবেশে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে গেলেও চিঠি মারফত তাহেরের সংগে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে কর্মীদের নির্দেশ দেন!
 
১৯৭৩ সাল থেকেই জাসদ একটা ‘বিপ্লবী পার্টি’ গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করে। পাশাপাশি চলছিল বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার কার্যক্রম। তাহের সেনাবাহিনীর কাজ এবং জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্বে ছিলেন। দলের সুপ্রিমো ছিলেন সিরাজুল আলম খান। জাসদ প্রতিষ্ঠার পর আশা করা
হয়েছিল দলটি গণতান্ত্রিক ও নির্বাচনী রাজনীতির ধারায় এগিয়ে যাবে এবং ১৯৭৩-এর সংসদ নির্বাচনে অংশও নিয়ে ছিলো। কিন্তু দলটিকে কব্জা করে নেন কর্নেল তাহের। তিনি চেয়েছিলেন চীনা গণবাহিনীর ধাঁচে সামরিক জান্তার অধীনে জনগণকে শাসন করবেন। তাই ১৯৭৪ সালেই জাসদের তথাকথিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আদর্শ দিয়ে সেনাবাহিনীর মধ্যে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ নামে সশস্ত্র একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। তাদের ইচ্ছা ছিল বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে কোনো অফিসার থাকবে না। সেনাবাহিনীর মধ্যে তাহেরের গণবাহিনী ‘শ্রেণিসংগ্রাম ও বিপ্লবের’ মন্ত্র ছড়িয়ে দেয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর মধ্যে রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে তারা চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। বঙ্গবন্ধুর সরকারকে উৎখাতের জন্য তাহেরের নিজস্ব পরিকল্পনা ছিল। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার ক্ষোভ ছিল অপরিসীম। তাহের মনে করতেন, সরকার সেনাবাহিনীর উন্নয়নে চরম অবহেলা দেখিয়ে রক্ষী বাহিনীর মত আধা সামরিক বাহিনী তৈরি করেছে। তিনি আরও দাবী করেন রক্ষী বাহিনীর হাতে তাদের ৩০ হাজার নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন।
 
বঙ্গবন্ধু মুজিব হত্যায় কর্নেল তাহের ও জাসদের ভূমিকা সম্পর্কে মার্কিন সাংবাদিক ও তাহেরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু লরেন্স লিফশুলজ লিখেছেন, ‘মুজিব উৎখাতের কয়েক মাস আগে থেকে জাসদ এক গণ-অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। স্বাধীনতাযুদ্ধের সাবেক সৈনিক সমবায়ে গঠিত বিপ্লবী গণবাহিনী ও কার্যরত সৈনিকদের গোপন সংগঠন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা; জাসদের এই দুই সশস্ত্র শাখা নিয়ে গোপন সামরিক অধিনায়ক তাহেরের নেতৃত্বে এই প্রস্তুতি চলছিল।’ (অসমাপ্ত বিপ্লবী, লিফশুলজ, পৃষ্ঠা ১৯, বাংলা সংস্করণ)। বিশিষ্ট গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদের মতে, তাহের ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে সরাসরি অংশ নেন নি। তবে ওইদিনই অভ্যুত্থানকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। তাহের মেজর রশীদের অনুরোধে সকাল নটায় ঢাকা বেতারকেন্দ্রে যান। তার পরামর্শে ডালিমরা সশস্ত্র বাহিনীর তিন প্রধানকে বেতার ভবনে নিয়ে আসেন অভ্যুত্থানকারীদের পক্ষ্যে বিবৃতি দেওয়ার জন্য।দুদিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নঈম জাহাঙ্গীর নারায়ণগঞ্জে তাহেরের বাসায় যান পরিস্থিতি আঁচ করতে। তাহের আক্ষেপ করে নঈমকে বললেন,‘ওরা বড় রকমের একটা ভুল করেছে। শেখ মুজিবকে কবর দিতে এ্যালাও করা ঠিক হয়নি। এখনতো সেখানে মাজার হবে। উচিৎ ছিল লাশটা বঙ্গোপসাগরে ফেলা দেওয়া।’ (জাসদের উত্থান-পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি: মহিউদ্দিন আহমদ)।
 
৭৫ এর ১৫ আগস্ট স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পরে ভেঙে পরে সামরিক বাহিনীর চেইন অফ কমান্ড। ২ নভেম্বর রাতে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনা অভ্যুত্থান ঘটে। খালেদ মোশাররফ যখন ক্ষমতা নিয়ে মোশতাকের সঙ্গে দরকষাকষি করছিলেন, তখন ৩ নভেম্বর মোশতাক ও তার সহযোগী আত্মস্বীকৃত খুনিরা জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করেন। এর পরপরই ক্ষমতাচ্যুত হন মোশতাক। আর খুনিদের দেশ ছেড়ে পালানোর পথ করে দেওয়া হয়। সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলার সুবাদে এবং ভারত-ভীতি কাজে লাগান জাসদের নেতারা। এতে নেতৃত্ব দেন সিরাজুল আলম খান ও অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল তাহের।
 
৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় জাসদের বিপ্লবী পার্টির ইমার্জেন্সি স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিং এ কর্নেল তাহের ঢাকা সেনানিবাসে অন্তরীণ জেনারেল জিয়ার হাতের লেখা একটা চিরকুট পড়ে শোনান। ইংরেজি চিরকুটের বাংলা হবে—আমি বন্দী, নেতৃত্ব দিতে পারছি না। আমার লোকেরা তৈরি। তুমি যদি নেতৃত্ব দাও, আমার লোকেরা তোমার সঙ্গে যোগ দেবে।(সূত্র: জাসদের উত্থান-পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি)। তাহের প্রস্তাব দেন, জিয়াকে সামনে রেখে অভ্যুত্থান ঘটাতে হবে এবং সকলে তার প্রস্তাবে সম্মতি দেন। রাত ১২টায় শুরু হয় অভ্যুত্থান। দেশের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানপন্থি সিপাহি আর জাসদের গণবাহিনীর হাজার হাজার সিপাহি এককাতারে নেমে আসে। এর সাথে যোগ দেয় বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা, শুরু হয় পাল্টা অভ্যুত্থান। “সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই-অফিসারের রক্ত চাই।" ৭ নভেম্বর সকালে স্লোগান দিতে দিতে তারা নৃশংসভাবে বন্দী অবস্থায় হত্যা করে খালেদ মোশারফ ও তাঁর সঙ্গে দুজন সহযোগী কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা ও লে. কর্নেল এ টি এম হায়দারকেও। এই তিনজনই ছিলেন একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা। সেদিন মুক্তিযোদ্ধার হাত রঞ্জিত হয় যোদ্ধাদেরই রক্তে। আর জাসদীরা এই রক্তের হুলিখেলার নাম দিয়েছিল 'বিপ্লব'!
 
প্রথম প্রহরেই তাহের মুক্ত করেন জিয়াকে এবং বসান ক্ষমতার মসনদে। জিয়াউর রহমান সামনে আসার পর সিপাহিরা তার নিয়ন্ত্রণে চলে যান। তাহেরের অনুরোধে সিপাহিদের সমাবেশে কোরআন শরিফ ছুঁয়ে জিয়া প্রতিজ্ঞা করেন যে, তাদের গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো মেনে নেবেন। জিয়াউর রহমান বলেছিলেন “Forgive and forget, let’s unite the Army.” সিদ্ধান্ত নিতে এক মুহূর্তও দেরি করেননি জিয়া। তিনি জানতেন, ওই সময় ক্ষমতার নিয়ামক হলো সেনাবাহিনী আর তিনি তার প্রধান। তাহের ক্ষমতার লড়াই থেকে ছিটকে পড়েন ও সরাসরি জিয়ার সঙ্গে সংঘাতে গেলেন এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ২১ জুলাই ১৯৭৬ সাজানো মামলায় '৭ নভেম্বরের ঘটনা'র সঙ্গে জড়িত অভিযোগে কর্নেল তাহের সহ বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার অধিকাংশ অফিসার ও জওয়ানকে কোর্ট মার্শালের প্রহসনে রাতের অন্ধকারে ফাঁসি দেয়া হয়! আর জাসদের লক্ষ্য শূন্য লক্ষ বাসনা নাটকের বেদনা বিধুর করুণ পরিণতি হয়।
 
জাসদের বিতর্কিত বিপ্লবের নিকৃষ্ট ফসল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান দেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় নিয়ে গিয়েছিলেন। একদিকে তিনি মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করেছেন, অপরদিকে পাকিস্তান ফেরতদের পুনর্বাসন করেছেন। জিয়াকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক বলা হলেও যে দলগুলো তিনি গড়েছেন তা সভাপতি-সম্পাদক সর্বস্ব, দলগুলির কোন কর্মী বা অফিস ছিলোনা। আর বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে আত্নস্বীকৃত যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। অন্যদিকে বাক স্বাধীনতার নামে বহু মতপ্রকাশের সংবাদপত্র গুলি সামরিক ফরমানের নিয়ন্ত্রনে প্রকাশিত হতো, যা সামরিক জান্তার মুখপাত্র হিসাবেই ভূমিকা রাখতো!
 
জাসদীরা মূলত অস্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতো, জনগণের উপর তাদের কোন আস্থা ছিলো না। তাই তাদের দুর্দিনে জনগণও এগিয়ে আসেনি। এক্ষেত্রে তাদের রাজনৈতিক কৌশলের সাথে বর্তমানের জামাতীদের সাদৃশ্যতা পাওয়া যায়। ফলশ্রুতি জনবিচ্ছিন্ন জামাতীরা টিকে থাকতে পারেনি। পরবর্তীকালে বিভিন্ন দলে পরগাছা হিসাবে ১৯৯৬ সালে জাসদের এক অংশের নেতা আ স ম আব্দদু রব আওয়ামী লীগের মন্ত্রী হন এবং ২০০১ সালে বিএনপির মন্ত্রী হন শাহজাহান সিরাজ। এছাড়াও জীবন সায়াহ্নে মেজর জালিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধিতাকারী দল জামায়াত ইসলামের নেতা হন! তবে ব্যর্থ বিপ্লবী জাসদীরা বেশী মাত্রায় ভর করেছে আওয়ামী লীগের উপর। জাসদের সভাপতি ও সদ্য সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, "আপনি (আ.লীগ নেতা) আশি পয়সা। আর এরশাদ, দিলীপ বড়ুয়া, মেনন আর ইনু মিললে এক টাকা হয়। আমরা যদি না থাকি, তাহলে আশি পয়সা নিয়ে রাস্তায় ফ্যা-ফ্যা করে ঘুরবেন। এক হাজার বছরেও ক্ষমতার মুখ দেখবেন না।" তার বক্তব্যে খোলসের আড়ালের আসল চেহারা বের হয়ে এসেছে। এই বক্তব্যের ব্যাপক প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের প্রকৃত সক্রিয় কর্মীরা অভিযোগ করেন, জাসদ বঙ্গবন্ধু হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলো এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ট্যাঙ্কের ওপর দাঁড়িয়ে ইনু সাহেব উল্লাস করেছিলেন ইত্যাদি... । সর্বশেষ সঠিক মন্তব্যটি করে সবার চোখ খুলে দিয়েছিলেন সাবেক সাধারণ সম্পাদক সদ্য প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, "জাসদ ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধারক-বাহকেরা শতভাগ ভণ্ড। তিনি আরও বলেন, জাসদ থেকে মন্ত্রী করায় আওয়ামী লীগকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।" (সূূূত্র: প্রথম আলো, ১৪, জুন ২০০১৬)। জাসদ নেতারা দল পাল্টে যখনি আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন তখনি জাসদের পুরানো কর্মীদের আওয়ামী লীগের পদ দিয়ে সক্রিয় করেছেন। এমনকি আওয়ামী লীগের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের কোণঠাসা করে মৃত জাসদ নেতার উত্তরাধিকারীদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে বিভাজনের রাজনীতি করছেন। আমাদের সতর্ক হতে হবে যেন এই আগাছা পরগাছা জাসদীরা নিজেদের স্বার্থ লুটে আমাদের প্রাণের সংগঠন আওয়ামী লীগকে ফোপড়া বানানোর সুযোগ না পায়।
 
লেখক:
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল,
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ ও
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট





নামাজের সময়সূচি

বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০১৯
ফজর ৪:২৬
জোহর ১১:৫৬
আসর ৪:৪১
মাগরিব ৬:০৯
ইশা ৭:২০
সূর্যাস্ত : ৬:০৯সূর্যোদয় : ৫:৪৩