বিতর্কিতদের মন্ত্রিসভায় দেখতে চাই না

০৭ জানুয়ারী, ২০১৯   |   thepeoplesnews24

সংগৃহীত

নঈম নিজাম

 

১৯৯৬ সালের কথা। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে বাংলাদেশ সফরে আসেন নেলসন ম্যান্ডেলা, ইয়াসির আরাফাত ও সুলেমান ডেমিরেল। রাজধানী ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এই বিশ্বনেতারা যোগ দেন এক বিশাল অনুষ্ঠানে। বাংলাদেশে এসে তারা ছিলেন আবেগাপ্লুত। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তারা জানতেন। তাই বঙ্গবন্ধুকন্যার আমন্ত্রণ ছিল অন্যরকম। এই তিন বিশ্বনেতা তাদের বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধুকন্যার প্রশংসা করে বলেছিলেন, শেখ হাসিনা অনেক দূর নিয়ে যাবেন বাংলাদেশকে। তাদের কথাই সত্যি হলো। শেখ হাসিনা আজ বিশ্ব ইতিহাসে নতুন অবস্থান গড়ে নিয়েছেন। সারা দুনিয়ার চোখ এখন বঙ্গবন্ধুকন্যার প্রতি। সবাই ইতিহাসকে জয় করতে পারেন না। শেখ হাসিনা পেরেছেন। এ ইতিহাসকে নিয়ে যেতে হবে আগামীর সুন্দর একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে। মানুষের প্রত্যাশার সেই আলো ছড়িয়ে পড়ুক নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের মধ্য দিয়ে। বিতর্কিত মানুষদের দেখতে চাই না মন্ত্রিসভায়। মানুষের প্রত্যাশা ক্লিন ইমেজের অধিকারীরাই থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। এ নিয়ে কোনো কথা নয়, আলোচনা নয়। কঠিন সত্যকে নির্মোহ চোখে বাস্তবায়ন করতে হবে। সবকিছু চলবে স্বাভাবিক নিয়মে। তবে পদে পদে থাকতে হবে সতর্ক। কারণ আওয়ামী লীগের আগামী অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের। এই বিশাল জয়ে দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে বাড়ল চ্যালেঞ্জ। কারণ শেখ হাসিনা এখন শুধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তার আলাদা অবস্থান। এ অবস্থান ধরে রেখেই আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য কাজ করতে হবে। বড় বিজয়ে প্রত্যাশা বেশি তৈরি হয়। আবার জনগণের হিসাব-নিকাশ বেড়ে যায়। ক্লিন ইমেজের মানুষের কোনো বিকল্প নেই এখন। পাশাপাশি লাগবে সাংগঠনিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা। ক্ষমতার মোহে সামান্য ভুল করলে মানুষ গ্রহণ করবে না। বিশাল জয়ের ধারাবাহিকতা বড্ড কঠিন। এ কঠিন কাজটি সহজভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। যা খুশি তা করার সুযোগ নেই। এ বিশাল বিজয়ে কারও খুশি হওয়ার কিছু নেই। এমপি সাহেবদের মনে রাখতে হবে, মানুষ তাদের ভোট দেয়নি। জনগণ ভোট দিয়েছে শেখ হাসিনাকে। এ কারণে এমপি-মন্ত্রীদের যা খুশি তা করা যাবে না। আবার কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না। অন্যায় করলে তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নিতে হবে। শেখ হাসিনা দলের সবারই হাঁড়ির খবর রাখেন। তিনি জানেন, কাকে কোথায় কাজে লাগাতে হবে। সবার দক্ষতা, সততা, নিষ্ঠাও তার জানা। গত ১০ বছর মন্ত্রী, এমপি হয়ে কারা বাণিজ্য করেছেন, কারা দলের নেতা-কর্মীদের কষ্ট দিয়েছেন, তৃণমূলকে কারা গুরুত্ব দেননি সব খবরই তাঁর অবগত। নতুন করে বলার কিছু নেই। টিআর, কাবিখা বিক্রি করা লোকজনকে মন্ত্রিসভায় দেখা গেলে আওয়ামী লীগের কর্মীরা ব্যথিত হবেন। নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িত থাকা এমপি-মন্ত্রীদের এবার ঠাঁই হলে হতাশা তৈরি হবে সমাজে। স্বচ্ছ, ক্লিন ইমেজের মানুষকে প্রাধান্য দেওয়ার বিকল্প নেই।

 

আমি বলছি না স্বপ্নের জগৎ থেকে সবকিছু তৈরি হবে। আসমান থেকে সবকিছু নেমে আসবে না। আল্লাহর প্রতি ভরসা রেখেই আগামীর কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। সেদিন এক অনুষ্ঠানে মোহাম্মদ এ আরাফাত বললেন, তারুণ্যের সামনে জিতবে এবার নৌকা গানটি ছেড়ে প্রতিক্রিয়া দেখেছেন। সবাই উচ্ছ্বাস নিয়েই এ গান গ্রহণ করে। তার মানে যে তারুণ্য হঠাৎ রাজপথে নেমে এসেছিল কোটা আন্দোলনে তারাই সমর্থন দিয়েছিল শেখ হাসিনাকে। যে স্কুলছাত্র সড়কে শৃঙ্খলার জন্য রাজপথে স্লোগান দিয়েছিল, আজ তারাই বলছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা। গাইছে তারুণ্যের গান। এই তারুণ্যকে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। তাদের হিসাব-নিকাশের মর্যাদা দিতে হবে। গত ১০ বছরে গড়ে ওঠা অর্থনীতির এই চাঙ্গা অবস্থান ধরে রাখতে হবে। কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে আর্থিক খাত। ব্যাংকিং খাতের সব শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। ঋণ প্রদানে ব্যাংককে হতে হবে সর্বোচ্চ সতর্ক। রেড অ্যালার্ট থাকতে হবে। অখ্যাত ব্যক্তি মুজিবকোট গায়ে দিয়ে ব্যাংকে গেলে তাকে জায়গা দেওয়া যাবে না। আবার বিখ্যাত ব্যক্তি ঋণখেলাপি হলে তাকে ঠাঁই দেওয়া যাবে না। সবকিছুতে থাকবে কঠোরতা। ব্যাংকের টাকা রাষ্ট্রের ও দেশের মানুষের। এই অর্থ নিয়ে বানরের পিঠা ভাগ চলবে না। সোমনাথ মন্দিরও বানানো যাবে না ব্যাংকিং খাতকে। পদে পদে চ্যালেঞ্জ থাকবে। সরকারের নিজের সমালোচনা নিজেকে করতে হবে। ’৭৩ সালের সংসদ মাতিয়ে রেখেছিলেন বিরোধী দলের দুই সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও এম এন লারমা। এবারও সংসদে আমরা তাই আশা করছি। সরকারকে ভুল ধরিয়ে দেওয়া গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হওয়ার কিছু নেই। বরং সহনশীলতা প্রয়োজন পদে পদে। মানুষের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে তা ধরে রাখতে হলে সবকিছু সামলে চলতে হবে বাস্তবতা মেনে। ইতিহাস বড়ই নিষ্ঠুর। তাই দেশকে রাখতে হবে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসমুক্ত। আইনশৃঙ্খলার লাগাম শক্ত হাতে ধরতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স অব্যাহত রাখতে হবে। কোনো অন্যায়কে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। অপরাধী আওয়ামী লীগের হলে তার বিরুদ্ধে বেশি ব্যবস্থা নিতে হবে। ছাত্রলীগ, যুবলীগকে সতর্ক রাখতে হবে। কাউকে কোনো বাড়াবাড়ি করতে দেওয়া যাবে না। অতি উৎসাহী, নবাগত, হাইব্রিডের সংখ্যা বাড়তে পারে। জোট শরিকদের মাঝেও অনেকে বাড়াবাড়ি করতে পারেন। সবার দিকেই চোখ রাখতে হবে। নবাগত, বহিরাগত আর হাইব্রিডরাই সর্বনাশ করতে পারে। এখন আওয়ামী লীগকে নিয়ে তাদের উৎসাহ বেশি দেখতে পাচ্ছি। মনে রাখা দরকার জয়ের আনন্দ অন্য কারও চোখের পানি যেন না হয়।

সহনশীল আচরণ করতে হবে বিরোধী দলের প্রতিও। রাজনীতির অনেক জটিল অঙ্ক থাকবে। সব হিসাব-নিকাশ হয়তো মিলবে না। তবু বাস্তবতাকে সামলে চলতে হবে। ক্ষমতার আগুনের তীব্র তাপ যেন বিরোধী পক্ষকে দাহ না করে। ইতিহাস সব সময় সহনশীলের পক্ষে। উদার গণতান্ত্রিক রীতিনীতিই মানুষ বঙ্গবন্ধুকন্যার কাছে প্রত্যাশা করে। আল্লাহ শেখ হাসিনাকে বিশালত্ব দিয়েছেন। জনগণ তার মূল্যায়ন করেছে। জনগণের প্রতি সেই সম্মান পুরো সরকারকে দেখাতে হবে। দেশের সর্বস্তরের মানুষের প্রতি কর্তব্যপরায়ণ হতে হবে সরকারকে। তাবারানি শরিফে পরিষ্কার বলা আছে, কেউ তার বাড়িতে গেলে বাড়ির মালিক যেখানে বসতে দেয় সেখানেই বসতে হবে। কারণ বাড়ির মালিকই জানেন তার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও প্রাইভেসি সম্পর্কে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গণমানুষের দল। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এ দেশকে স্বাধীন করেছে আওয়ামী লীগ। তার মেয়ে আজ সারা বিশ্বে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। এই সৃষ্টি আগলে রাখার দায়িত্ব আওয়ামী লীগের প্রত্যেক নেতা-কর্মীর। আমি বলছি না খলিফা ওমরের যুগ ফিরে আসবে। কিন্তু শেখ হাসিনার রক্তের সঙ্গে বাংলাদেশের অস্তিত্ব জড়িয়ে রয়েছে। তাই আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে ভাবতে হবে। মর্যাদার উচ্চ আসনে নিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশকে। নতুন করে ব্র্যান্ডিং করতে হবে সবকিছু। সে কারণেই বাংলাদেশে প্রতিহিংসার কোনো আগুন থাকবে না। উন্নত-সমৃদ্ধ হবে বাংলাদেশ। সবকিছু হবে রাজনৈতিকভাবে ও প্রতিহিংসামুক্ত। বঙ্গবন্ধুর পুরো রাজনৈতিক জীবনই ছিল মানুষের জন্য। তিনি সবাইকে সমদৃষ্টিতে দেখতেন। তাঁর মেয়েকেও একই হতে হবে। আমরা জানি শেখ হাসিনা স্বপ্নজগতের কেউ নন। তিনিও মানুষ। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এবার তাকে স্বাপ্নিক চোখেই দেখছে। এ কারণে প্রত্যাশা বেড়ে গেছে অনেক দূর। এ প্রত্যাশা হলো, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ দিয়েছেন। শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে করবেন উন্নত ও সমৃদ্ধ। সেই সমৃদ্ধি হবে বিশ্ব উচ্চতার ও সুন্দর আগামীর। আমি বিশ্বাস করি পাঁচ বছর পর আমরা তা-ই পাব। গত ১০ বছরের চেয়ে বেশি উন্নয়ন হবে আগামী পাঁচ বছরে। সেই উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে সেই রকম মন্ত্রিসভা লাগবে। প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যেক সহযোদ্ধা হবেন ইতিবাচক ধারার আধুনিক চিন্তার পরিশীলিত মানুষ। যারা বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবেন। একজনই সর্বনাশ করতে পারেন একটি টিমের। সেই একজন বিতর্কিত মানুষ যেন ঠাঁই না পান মন্ত্রিসভায়। নবীন-প্রবীণের সমন্বয় থাকুক। প্রবীণের প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা, নবীনের তারুণ্যই পারে অনেক কিছু করতে। টিমওয়ার্ক সবসময় জরুরি। বিএনপির এবার সর্বনাশ হয়েছে টিমওয়ার্ক না থাকার কারণে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী কাজে সমন্বয় ছিল। সেই সমন্বয়কে কাজে লাগাতে হবে নতুন মন্ত্রিসভায়ও। সরকারের অনেক কাজ। অগ্রাধিকার খাতগুলো পড়ে আছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন নির্বাচনী ইশতেহার। এবারও আওয়ামী লীগের ইশতেহার ভালো ছিল। সেই ইশতেহার বাস্তবায়নে অনেক ভালো মানুষের দরকার। হয়তো অনেকে ভাববেন কেন এত কথা বলছি? এই বলার কারণ আছে। দক্ষ, সৎ, নিষ্ঠাবান মানুষকে নিয়ে চিন্তায় থাকতে হয় না আমাদের। খারাপ লোক বেশি হলে একদিকে দলের ক্ষতি, অন্যদিকে আমরা মিডিয়াকর্মীরাও বিপাকে পড়ি। মিডিয়াকর্মীদের বিপদ নিয়ে একটা পুরনো গল্প মনে পড়ছে। এক ছেলের চাচা মারা গেছে। পাড়া-পড়শিরা তার কান্না থামাতে পারছে না। সবাই বলছে, তোমার চাচা মারা গেছে, এত কান্নার কী আছে? বাবা মারা গেলে কী করবে? ছেলেটি বলল, চাচা মরেছে চিন্তা নেই। কিন্তু যম বাড়ি চিনে গেল! চিন্তা যমের বাড়ি চেনা নিয়ে। সরকার গঠনের এক দিন পরই ডিজিটাল আইনে খুলনার সাংবাদিক হেদায়েত গ্রেফতার হন। দোষ ছিল প্রশাসনের। সেই দোষ গিয়ে পড়ল সাংবাদিকের ওপর! সরকারের সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ হেদায়েতের মুক্তির ব্যবস্থা দ্রুত করার জন্য। আমরা চিন্তায় আছি জটিল, অন্যায়, অসংগতির সঙ্গে জড়িত মানুষগুলোকে নিয়ে। একটা সরকারে সবাই ভালো মানুষ হবেন এমন কথা নেই। আর ভালো মানুষকে নিয়ে চিন্তাও নেই। এই সমাজ তো দুর্নীতিমুক্ত নয়। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোও অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ। দেখা যায় মাদক, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস সবকিছুতেই অনেক প্রভাবশালী অনেক সময় জড়িয়ে পড়েন।

প্রশাসন ইচ্ছা থাকলেও অনেক সময় ব্যবস্থা নিতে পারে না। তাই আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য শুরুটা ভালো হোক। ভালো, দক্ষ মানুষকে দেখতে চাই মন্ত্রিসভায়। সব অন্যায়ের বিপক্ষে সরকার থাকবে জিরো টলারেন্সে। ঘটনা ঘটলেই নিতে হবে ব্যবস্থা। অপরাধী যে দলের হোক না কেন, কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। (সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন)

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

 

 






নামাজের সময়সূচি

বৃহস্পতিবার, ১৭ জানুয়ারী, ২০১৯
ফজর ৪:২৬
জোহর ১১:৫৬
আসর ৪:৪১
মাগরিব ৬:০৯
ইশা ৭:২০
সূর্যাস্ত : ৬:০৯সূর্যোদয় : ৫:৪৩