বিএনপিকে ধন্যবাদ, ধন্যবাদ জামায়াতকেও!

২৯ নভেম্বর, ২০১৮   |   thepeoplesnews24

ফাইল ছবি

অনলাইন ডেস্ক:

বিএনপিকে ধন্যবাদ। ধন্যবাদ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে। ধন্যবাদ জানাচ্ছি তাদের স্বচ্ছতার জন্য। তাদের  প্রকৃত চরিত্র শেষ পর্যন্ত গোপন না করার জন্য। আর জামায়াতকে ধন্যবাদ ধানের শীষে একাকার হয়ে তারা প্রমাণ করেছেন, আদর্শে জামায়াত আর বিএনপির মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। যা অনেক আগেই বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, ‘বিএনপি জামায়াত এক মায়ের পেটের দুই ভাই। ’
এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ভোটের জন্য নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর চরিত্র উন্মোচনের জন্য। এবারের নির্বাচনের আগেই প্রমাণ হয়ে গেছে কার কে শত্রু, কার কে মিত্র। রাজনীতিতে শত্রু মিত্র’র ধারণা নয়। প্রকৃত অর্থেই আমার ভালোবাসা আর স্বপ্নের শত্রু মিত্র চিহ্নিত করে দেওয়ার জন্য।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আর বিএনপি-জাময়াতের ২০ দলীয় জোট এখন একাকার। ধানের শীষের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শুধু জামায়াত নয়। উদ্বুদ্ধ ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ আরও অনেক। ড. কামাল ভেবেছেন তিনি নির্বাচন না করলে তো আর ধানের শীষ নিতে হবে না। কিন্তু লেজ তো আর লুকনো যায় না। তার দল তো নিয়েছে।

ড. কামাল-মান্নারা ধানের শীষে আস্থা রাখতেই পারেন। কেউ তাদের ফসলের ক্ষেতে নতুন চেতনার চাষাবাদ করতেই পারেন। কিন্তু তারা ধানের শীষ নয়, আসলে জামায়াতগ্রস্ত হয়েছেন। জামায়াতে বিলীন হয়েছেন। ধানের শীষের ছায়ায় তারা এখন জামায়াত দেহে লীন হয়েছেন। গঙ্গা,যমুনা, সরস্বতী যেমন এক দেহে লীন হয়।

শুরুতে তারা বলেছেন স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতকে ফ্রন্টে নেওয়া হবে না। বিএনপিকে জামায়াত ত্যাগ করে আসতে হবে ফ্রন্টে। তারপর বিএনপি ফ্রন্টে এলো ২০ দলীয় জোট থেকে জামায়াতকে বাদ না দিয়েই। আর বিএনপি একটা ধোয়াশা তৈরি করে রাখে বলে জামায়াতের ব্যাপারে সময় মতো সিদ্ধান্ত হবে। জামায়াতের নিবন্ধন নেই। তার প্রতীক দাড়িপাল্লাও নেই। জামায়াত বললো তারা ধানের শীষ নেবে না, স্বতন্ত্র নির্বাচন করবে। আর এই ফাঁকে ধানের শীষে আস্থা স্থাপন করলেন ফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেন ও মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ অন্যরা। খেলা এখানেই। শেষবেলায় এসে ধানের শীষ ভালোবেসে ফেললো জামায়াত। জামায়াত, বিএনপি আর ফ্রন্ট একাকার হয়ে গেলো, যেন একই মা ধানের শীষের সন্তান হয়ে উঠলেন তারা। হলেন একই প্রতীকে আস্থাশীল। আদর্শিক মিল না থাকলে কি এতটা কাছে আসা যায়? এতটা ভালোবাসা যায়?

এবার লেখার লাগাম থামিয়ে কিছু ধারণায় উপনীত হওয়ার চেষ্টা করি-

১. জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের সময় জামায়াতকে আড়ালে রাখা ছিল বিএনপি এবং ড. কামাল হোসেনের একটি কৌশল। 

২. তারা সাধারণ মানুষকে এই কৌশলে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

৩. ধানের শীষ প্রতীক নয় , স্বতন্ত্র নির্বাচনের ঘোষণাও ছিল জামায়াতের একটি কৌশল।

৪. ড. কামাল হোসেন এবং মাহমুদুর রহমান মান্নারা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপির আদর্শে আস্থা স্থাপন করেছেন।

৫. জামায়াতকে বিএনপি ধানের শীষ দিয়ে আদর্শিক ভাই হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে।

৬. আর এই ধানের শীষ প্রতীকে সবার নির্বাচনের সিদ্ধান্ত বিএনপি, জামায়াত , ড. কামাল ও মান্নাদের একটি জোটে নিয়ে এসেছে।

৭. এখন তাই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে জামায়াত এবং ২০ দলের বাকি দলগুলোও অন্তর্ভুক্ত হলো।

৮. জামায়াত-বিএনপিতে একাকার হয়ে গেলো জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

স্বাধীনতাবিরোধী ও একাত্তরে গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত দল জামায়াতে ইসলামীকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন জিয়াউর রহমান। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে জিয়াউর রহমানের স্ত্রী এবং তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জামায়াত নেতাদের মন্ত্রী বানিয়ে গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়ে তাদের একসঙ্গে কয়েক ধাপ এগিয়ে দেন। স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতা,মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযোদ্ধাদের উপহাস করে এই মাটিতে দাঁড়িয়ে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু করেন। আর তখন বিএনপি জামায়াতের পক্ষেই অবস্থান নেয়। তারা যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ‘অস্বচ্ছ’ বলে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের রক্ষার নানা ফন্দি করে। তারা ‘স্বচ্ছ বিচারের’ ধুয়া তুলে যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধ করতে অপচেষ্টা চালায়। 

আর ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে পরে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে দেশে ‘আগুন সন্ত্রাস’ চালায়। ওই আগুন সন্ত্রাসের পর চাপে পড়ে বিএনপি। দেশে তো বটেই বিদেশি বন্ধুদের কাছ থেকেও জামায়াত ত্যাগের চাপ আসে বিএনপির ওপর। বিদেশি কূটনীতিকরা বারবার জামায়াতের ব্যাপারে বিএনপির অবস্থান জানতে চায়। কিন্তু বিএনপি ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ অবস্থান নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখে।

আদালতের রায়ে জামায়াত সংগঠন হিসেবেও যুদ্ধাপরাধী। যুদ্ধাপরাধী সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচারের দাবি বহু দিনের। আর যুদ্ধাপরাধী সংগঠন হিসেবে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে আদালতের নির্দেশে। তাদের প্রতীক দাড়িপাল্লাও তারা হরিয়েছে আদালতের নির্দেশে। এই নিস্তেজ হয়ে পড়া যুদ্ধাপরাধীদের দলটিকে আবার কৌশলে সতেজ করে তোলার দায়িত্ব নিয়েছে বিএনপি। আর বিএনপিকে এই কাজে সহায়তা করছেন ড. কামাল হোসেন এবং মাহমুদুর রহমান মান্নারা। এতদিন তারা রাখঢাক করতেন। কিন্তু নির্বাচনের ঠিক আগে তাদের ঘোমটা সরে গেলো। ধানের শীষের মাধ্যমে তারা জামায়াতকে ঐক্যফ্রন্টে নিয়ে গেলেন। এখন ধানের শীষ হলো ঐক্যফ্রন্টের প্রতীক। আর এই প্রতীকের ছায়ায় জামায়াত, বিএনপি, গণফোরাম, নাগরকি ঐক্য একাকার।

ড. কামাল হোসেন এবং মাহমুদুর রহমান মান্নারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নামে ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছিলেন। তারা বলেছিলেন দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ফিরিয়ে আনতে মাঠে নেমেছেন। আসলে এখন দেখা গেলো তারা জামায়তকে নতুন জীবন দিচ্ছেন। বিএনপির জামায়াত রক্ষার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। খালেদা জিয়া মুক্তি পাননি। কিন্তু জামায়াত ধানের শীষ পেয়েছে।

খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারছেন না। জামায়াত সগৌরবে নির্বাচন করছে। আর যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্তদের সন্তানরা মনোনয়ন পেয়েছে। ঐক্যফ্রন্ট কোনও বাধা হয়নি।

জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে কীভাবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা যায় আমার জানা নেই। বিএনপির হিডেন এজেন্ডা বাস্তবায়ন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে কোনও কাজে আসবে কিনা জানি না। এতে দেশের কতটুকু লাভ হবে তা দেশের মানুষই ভালো বুঝবেন। তবে আমি খুশি হয়েছি। খুশি হয়েছি অন্য কারণে। আর তা হলো এই ঐক্যফ্রন্টের কারণে তাদের চরিত্রগুলো স্পষ্ট করে বুঝতে পারলাম। আর তা হলো:

১. জামায়াত বিএনপির ঐক্য আদর্শিক ঐক্য। তাই জামায়াতকে ধানের শীষ দিতে আর জামায়াতের ধানের শীষ নিতে কোনও আপত্তি ওঠেনি।

২. জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট জামায়াত বিএনপির আদর্শে পরিচালিত।

৩. ড. কামাল হোসেন ও মাহমুদুর রহমান মান্নারা চরিত্র গোপন করতে পারেননি। তারা যে বিএনপির মতোই জামায়াতের ভাই বন্ধু–তা প্রকাশ হলো।

৫. বিএনপি-জামায়াত ঐক্যফ্রন্ট এখন ধানের শীষ প্রতীকের চেতনায় উদ্বুদ্ধ। 

আর এই সত্য শেষ পর্যন্ত প্রকাশ করার জন্য আমি বিএনপিকে ধন্যবাদ জানাই। ধন্যবাদ জানাই জামায়াতকেও। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকেও ধন্যবাদ জানাই। ঐক্যফ্রন্ট না হলে এতগুলো সত্য আমি এত দ্রুত জানতে পারতাম না। চরিত্রগুলো ধরতে পারতাম না।

ঐক্যফ্রন্ট গঠনের শুরুতে আমরা অনেকেই মনে করেছিলাম স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন সত্যিই গণতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ে নামছেন। তারপর প্রশ্ন উঠতে থাকে কার ঘাড়ে কে চেপেছেন? ড. কামালের ঘাড়ে বিএনপি? না বিএনপির ঘাড়ে ড. কামাল। কিন্তু এখন স্পষ্ট কেউ কারোর ঘাড়ে চাপেননি। তারা আসলে একই মত ও পথের যাত্রী। তাই যদি না হবে তাহলে জামায়াতকে জীবন দিতে এত কৌশল কেন? আর জামায়াতইবা কেন তাদের কথামতো দূরে থাকবে! এই দূরে থাকা বা রাখা ছিল সময়ের অপেক্ষা। সময় মতো কাছে নিয়েছে। বসতে দিয়েছে। ঘর দিয়েছে। নির্বাচনে একই ছাতা দিয়েছে। তাদের এই যাত্রা এখন এক পথে, এক মতে।

পাদটীকা:

ড. কামাল হোসেন নির্বাচন করবেন না। তবে তার দলের যারা নির্বাচন করছেন তারা ধানের শীষেই করছেন। ড. কামাল হয়তো ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করতে একটু লজ্জা পাচ্ছেন। তাই ভোটেই এবার দাঁড়াননি। আমি বলি লজ্জা পাওয়ার কী আছে! যাকে ভালোবাসেন তার জন্য একটু কলঙ্ক তো গায়ে নিতেই হবে। সাধকরা তো বলেই দিয়েছেন–‘নিন্দার কাঁটা যদি না বিঁধিল গায়ে, তবে প্রেমের কী স্বাদ আছে বলো।’

 

হারুন উর রশীদ

লেখক: সাংবাদিক






নামাজের সময়সূচি

সোমবার, ২৭ মে, ২০১৯
ফজর ৪:২৬
জোহর ১১:৫৬
আসর ৪:৪১
মাগরিব ৬:০৯
ইশা ৭:২০
সূর্যাস্ত : ৬:০৯সূর্যোদয় : ৫:৪৩