একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন রাজশাহী সদরে মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে যারা

১১ আগস্ট, ২০১৮   |   thepeoplesnews24

সংগৃহীত

রাজশাহী প্রতিনিধি:

নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী অক্টোবরে তফসিল ও ডিসেম্বরের ভোট একাদশ জাতীয় সংসদের। এরই মধ্যে দলগুলোও নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। বিভিন্নভাবে জরিপ চালিয়ে প্রার্থী চূড়ান্তের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে দলগুলোও। ফলে তৎপর রয়েছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা।

পরপর দুই বার আওয়ামী লীগের টিকিটে সংসদ নির্বাচিত হয়ে ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশা। এছাড়া জোটের প্রধান শরিক ক্ষমতাসীন দলেও বেশ প্রভাব রয়েছে তার। তাই জোটগত নির্বাচন হলে মনোনয়ন দৌড়ে তাকেই এগিয়ে রাখছেন সবাই।

পুরো সিটি করপোরেশন এলাকা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-২ আসন। এখানে নব্বই-উত্তর গণতান্ত্রিক নির্বাচনে প্রথম নৌকার জয় হয় ২০০৮ সালে। সেবার আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোট করে এমপি নির্বাচিত হন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা।

২০১৪ সালের নির্বাচনেও দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। টানা দুই মেয়াদে জোটের এমপি থাকায় আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডে বেশ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন ওয়ার্কার্স পার্টির এই কেন্দ্রীয় নেতা।

নৌকার মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে জোটের নেতা ফজলে হোসেন বাদশা এগিয়ে থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ এ আসনে এবার তাকে ছাড় দিতে নারাজ মহানগর আওয়ামী লীগের একটি অংশ। তারা চাইছেন আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী দিতে। তাদের এ দাবি ইতোমধ্যে দলের হাইকমান্ডেও তুলে ধরা হয়েছে।

এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন স্বপ্ন দেখছেন অন্তত হাফ ডজন নেতা। তবে তাদের মধ্যে প্রকাশ্যে রয়েছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার। রাজশাহীর উদীয়মান তরুণ নেতৃত্ব হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ডাবলু সরকার বিভিন্ন সময় রাজশাহী সদর আসনে দলের নেতাকে মনোনয়ন দেয়ার জন্য হাইকমান্ডে দাবি তুলেছেন। তার সঙ্গেও রয়েছেন নগর আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দৌড়ে এক ধাপ এগিয়ে রয়েছেন তিনি।

মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার বলেন, বর্তমানে আওয়ামী লীগের ভোট অতিতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এই ভোটকে কাজে লাগাতে তিনি সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থিতা চাইবেন।

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান এমপি উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন মেয়র হয়েছেন। আওয়ামী লীগের কোনো নেতা সদর আসনের এমপি হলে উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে। তাই আমরা চাই, এবার সদর আসনে মনোনয়নে পরিবর্তন। এখনে আওয়ামী লীগেরই প্রার্থী দেওয়া হোক।’

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এখানে বাদশার মনোনয়ন অনেকটাই নিশ্চিত। কেন্দ্রীয় মহাজোটে বাদশার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। দুই মেয়াদে সাংসদ বাদশা রাজশাহীর উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় এ অঞ্চলের মানুষকে উজ্জীবিত করতে বাদশার অবদান অসামান্য। এ ছাড়া দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই আর সংগ্রামের অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ বাদশার প্রতি রয়েছে মানুষের ভালোবাসা। এ আসনের ভোটাররা তাকে সজ্জন ব্যক্তি হিসেবেই জানেন।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার রাজশাহী বিমানবন্দর এবং রেশম কারখানা বন্ধ করে দেয়। ফজলে হোসেন বাদশা তার নির্বাচনী অঙ্গীকারে এ দুটি প্রতিষ্ঠান চালুর প্রতিশ্রুতি দেন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, বিমানবন্দর চালু করেন বাদশা। রেশম কারাখানাও চালুর প্রক্রিয়ায় রয়েছে। আর তাই রাজশাহীর জনমত বাদশার পক্ষে রয়েছে বলে মনে করছেন তার অনুসারীরা।

রাজশাহীর উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং আগামী নির্বাচন সম্পর্কে ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, ‘শিক্ষাক্ষেত্রে রাজশাহীর উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু শিল্পক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। রাজশাহীর বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের দরকার। বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার জন্য রাজশাহীতে পোশাক কারখানাসহ শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। আমি এবং নবনির্বাচিত মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বিষয়গুলো রাজশাহীবাসীর কাছে উত্থাপন করেছি। তারা আমাদের এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছে। আমি ও লিটন এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চাই।’

এছাড়া, এই আসনে বিএনপির মনোনয়নের ক্ষেত্রে যদিও বেশ এগিয়ে রয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু। তবে তার দুশ্চিন্তা কেন্দ্রীয় নেতা রুহুল কবির রিজভীকে নিয়ে। মিনুর সঙ্গে মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সদ্য সাবেক সিটি মেয়র মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের বিরোধ রয়েছে।

মিনু বিরোধীরা এ আসনে প্রার্থী হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিপি রুহুল কবির রিজভীর পক্ষে কাজ করছেন। তারা আপাতত প্রকাশ্যে রিজভীর কথা বললেও বিকল্প প্রার্থী হিসেবে বুলবুলকে নিয়ে ভাবছেন। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মিনুর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মিনুর বিকল্প হিসেবে রিজভী অথবা বুলবুলকে দেখছেন তারা।

মিনু ২০০১ সালে সংসদ নির্বাচিত হন। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত টানা সংসদ সদস্য ছিলেন তার রাজনৈতিক গুরু কবির হোসেন। এ ছাড়া কবির হোসেন ২০০১ সালে রাজশাহী-৬ আসন থেকে সংসদ নির্বাচিত হন। কবীর হোসেন ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত প্রথমে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমাবায় এবং পরে ভূমি প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।

তিনি এবার রাজশাহী-২ আসনে মনোনয়ন পেতে চেষ্টা করছেন। রাজশাহী-২ আসনের সঙ্গে আগে পবা উপজেলা যুক্ত ছিল। ২০০৮ সালে সীমানা পুনর্নিধারণ করা হয়। এ সময় শুধু সিটি করপোরেশনের ৩০টি ওয়ার্ড নিয়ে এ আসন গঠিত হয়। এ আসন থেকে ২০০১ সালে এমপি নির্বাচিত হন মিনু। এ ছাড়া একটানা ১৭ বছর ছিলেন রাজশাহীর মেয়র। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মিনু এখন দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা।

রাজশাহী অঞ্চলে বিএনপিকে দীর্ঘ সময় ধরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন মিনু। মূলত ৮০ ও ৯০-এর দশকে মিনু দক্ষ সংগঠক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। মিনুর নেতৃত্বেই এ অঞ্চলে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তিনি মহানগর বিএনপির সভাপতি হিসেবে দুই যুগ দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এবার মহানগর বিএনপির সভাপতি হিসেবে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এর ফলে বুলবুলের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন মিনুর অনুসারীরা। মিনুর সমর্থক নেতাকর্মীরা গঠন করেন ‘বিএনপি বাঁচাও কমিটি’।

মিনুর সমর্থকরা বলছেন, মিনুই পুরো উত্তরাঞ্চলে বিএনপির প্রাণ। তিনি ত্যাগী ও কর্মীবান্ধব। রাজনৈতিকভাবে বিচক্ষণ ও দূরদর্শী। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে এমপি নির্বাচিত হন তিনি। মিনুর ডাকে যে কোনো সময় হাজার হাজার নেতাকর্মী রাস্তায় নেমে আসেন। সংগঠনের প্রতি মিনুর আন্তরিকতা, ত্যাগ ও দায়বদ্ধতার কারণে বিএনপির হাইকমান্ড তাকে রাজশাহী সদর আসনে মনোনয়ন দেবে বলে তাদের দাবি।

মিজানুর রহমান মিনু বলেন, ‘বিএনপি দেশের একটি উদার গণতান্ত্রিক ও নির্বাচনমুখী দল। আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আমরা নির্বাচন চাই। আর বিএনপি এ নির্বাচনে অংশ নিলে রাজশাহী বিভাগের ১৮ থেকে ১৯টি আসনে বিজয়ী হবো।’

রাজশাহীতে বিএনপির মধ্যে কোনা দ্বন্দ্ব নেই দাবি করে মিনু বলেন, ‘আমরা পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দল পরিচালনা করছি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল আমাকেই মনোনয়ন দেবে।’

রাজশাহীতে রিজভীর নির্বাচনের প্রস্তুতির গুঞ্জন এখন দৃশ্যমান হচ্ছে নগরীর বিভিন্ন স্থানে তার পোস্টারের মাধ্যমে। মিনু বিরোধীরা রিজভীর জন্য ইতোমধ্যে ভোটের মাঠে নেমেছেন। ঈদসহ বিভিন্ন জাতীয় দিবসে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এবং মোড়ে রিজভীর পোস্টারে নগরবাসীর কাছে দোয়া চাওয়া হচ্ছে। রিজভী দীর্ঘসময় রাজশাহীতে রাজনীতি করেছেন। রাজশাহীর নেতাকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে তার।

রিজভী-বুলবুল পক্ষের নেতাকর্মীরা বলছেন, তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতা থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হয়েছেন। রাকসুর ভিপিও ছিলেন তিনি। বর্তমানেও রাজশাহীর বিএনপির রাজনীতিতে তার ভূমিকা বিদ্যমান। এসব বিবেচনায় তার পছন্দমতো রাজশাহী-২ আসনে প্রার্থিতা করার সুযোগ পেতে পারেন বিএনপির ক্রান্তিকালের সোচ্চারকণ্ঠ রিজভীকে।

তাদের দাবি, রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মিজানুর রহমান মিনুর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ নিয়ে কেন্দ্র তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। সম্প্রতি তৃণমূল বিএনপির সঙ্গে হাইকমান্ডের বৈঠকে মিনু বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ ওঠে এবং তার বিরুদ্ধে সংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো হয়। সে ক্ষেত্রে মিনুর বিকল্প প্রার্থী হিসেবে রিজভী অথবা বুলবুলকে নিয়ে ভাবতে দলের হাইকমান্ড তারা দাবি জানাবে।