জেগেছে নতুন প্রজন্ম, আশায় বাঁধি বুক

০৫ আগস্ট, ২০১৮   |   thepeoplesnews24

সংগৃহীত

ইসহাক খান

 

চারদিকে অভাবনীয় ঘটনা ঘটছে। যা ভাবিনি, যা আশা করিনি, তা-ই ঘটে চলেছে। নতুন প্রজন্মের এই আন্দোলন আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। আশার আলো জ্বালিয়েছে অন্তরে।

পুলিশ যা পারেনি, ট্রাফিক যা পারেনি, সিটি করপোরেশেন যা পারেনি, এমনকি সরকার যা করতে সাহস পায়নি, তা-ই করে দেখাল আমাদের পরের প্রজন্ম, আমাদের সন্তানরা।

ঘটনার সূত্রপাত এয়ারপোর্ট রোডে দুজন শিক্ষার্থীকে বাসচাপা দিয়ে হত্যার কারণে। এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে, কিছুই হয়নি। সরকার তাদের বিরুদ্ধে কিছু করতে সাহস পায়নি। মিশুক মুনির এবং তারেক মাসুদকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যা করার পর গাড়িচালকদের শাস্তি দেওয়ায় তারা দেশ অচল করে দেয়। অভিযোগ আছে, সে ঘটনায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। তিনি আবার পরিবহন শ্রমিকদের নেতা। সরকারের মন্ত্রী হয়ে তিনি সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। সরকার তাতে বিব্রত হলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো সাহসী ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয় সরকার। এই মন্ত্রী শ্রমিকদের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে বলেছিলেন, রাস্তায় গরু-ছাগল চিনলেই লাইসেন্স পাওয়ার অধিকার রাখে একজন গাড়িচালক। তিনি যখন ছাত্র হত্যার পর হাসিমুখে ভারতের দুর্ঘটনার তুলনা দিলেন, আমরা তাঁর বক্তব্য শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আর তখনই শান্ত দিঘির জল উত্তপ্ত হয়ে ফুলেফেঁপে দুকূল প্লাবিত করে ধেয়ে চলতে শুরু করল নগরে-বন্দরে, গ্রাম-লোকালয়ে। এই ধাবমান যাত্রার শেষ দেখা যাচ্ছে না। আমাদের সন্তানরা আর শিশু থাকেনি। তারা ক্ষুব্ধ হয়ে রাতারাতি রাষ্ট্রের প্রতিবাদী যুবকে পরিণত হয়েছে। রাস্তা অবরোধ করে তারা গাড়ি থামিয়ে চালকের লাইসেন্স দেখছে। লাইসেন্স থাকলে তাকে যেতে দিচ্ছে। লাইসেন্স না থাকলে তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো, তারা রাজধানীতে একজন মন্ত্রীর গাড়িচালকের লাইসেন্স না থাকায় মন্ত্রীকে নামিয়ে পুলিশের গাড়িতে তুলে দিয়েছে। রাষ্ট্রের যারা কর্তা, তাদের গাড়িচালকের কেন লাইসেন্স থাকবে না? এই কথাটা আমরা অথর্বরা এত দিন জোর দিয়ে বলতে সাহস পাইনি, তোমরা সেই কাজ করে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখালে। শেখালে কিভাবে ন্যায় কাজ করতে হয়। আমাদের এই শেখায় কোনো গ্লানি নেই। আমরাও ভুল করতে পারি। তোমরা নতুনরা সেই ভুল ধরিয়ে দিয়ে আমাদের পাপমুক্ত করেছ।

তোমরা যে কাজ করছ, সে কাজ ছিল ট্রাফিক পুলিশের এবং বিআরটিএর। কিন্তু তারা তা করেনি। পুলিশ লাইসেন্স না পেলে খুশি হতো। কিছু কামাই করে নিতে পারত। লাইসেন্স থাকলে বরং বিরক্ত হতো। লাইসেন্স থাকায় টাকা নিতে পারত না। এ কারণে বিরক্ত। আর বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ টাকার বিনিময়ে ডুপ্লিকেট লাইসেন্স দিয়ে সড়কে অরাজকতা সৃষ্টির পথ তৈরি করত।

হে আমার প্রিয় সন্তানরা, ‘আমরা গর্বিত তোমাদের কাজে। তোমরা আমাদের মনে আশার বীজ বপন করেছ। আমরা ধন্য তোমাদের মতো সন্তান জন্ম দিয়ে।

এখন তোমাদের কাছে আমাদের কিছু মিনতি। পরামর্শ দেওয়ার অধিকার আমরা হারিয়ে ফেলেছি। যুদ্ধ করে তোমাদের জন্য স্বাধীন দেশ এনে দিয়েছি সত্য। কিন্তু তোমাদের সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠার পথ আমরা তৈরি করে দিতে পারিনি। পারিনি বলেই তোমরা আজ রাজপথে। এ জন্য তোমাদের পরামর্শ দেওয়ার অধিকার আমরা হারিয়ে ফেলেছি। একাত্তরের যোদ্ধা হিসেবে কিছু সতর্কবাণী তোমাদের মনে করিয়ে দিতে চাই। যে ভুল আমরা করেছি, সে ভুল তোমরা যেন না করো। সেই কারণে এই মিনতি। তোমাদের এই মানবিক আন্দোলনে বিপথগামীরা ঢুকে তোমাদের বিভ্রান্ত করতে চাইবে। ইতিমধ্যে তারা ঢুকেও পড়েছে। তারা কোথাও কোথাও গাড়ি ভাঙচুর করছে। তাদের ব্যাপারে তোমাদের সতর্ক থাকতে হবে। তোমাদের বুঝতে হবে, এটা আমাদের সার্বিক মানবিক উন্নয়নের আন্দোলন। এখানে পরাজিত শত্রুরা তাদের ফায়দা হাসিলের জন্য তোমাদের বিভ্রান্ত করতে চাইবে। তোমরা কোনোভাবেই তাদের পাতা ফাঁদে পা দেবে না।

আমার একজন পরিচিত জামায়াতপন্থী কবি, আনন্দে গদগদ হয়ে লিখেছেন, ‘ভালো লাগছে এই আন্দোলনে, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ উচ্চারিত হচ্ছে না।’

জয় বাংলা শুনলে তাদের বুক কাঁপে। ভয়ে তারা সংকুচিত হয়। তাদের হার্টবিট বেড়ে যায়। তাদের পরাজয়ের কথা মনে পড়ে। তারা কষ্ট পায়।

আমি সেই জামায়াতি কবিকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’র চেয়ে অনেক বড় কথা তারা প্ল্যাকার্ডে লিখে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছে। তোমরা তা দেখতে পাচ্ছ না। তোমরা অন্ধ। বধির।

আমি আমার সোনার ছেলেদের সেই অমর বাণীর প্ল্যাকার্ডটি দেখে ভীষণ অভিভূত। সত্যি কথা বলতে কী, তাদের সেই কথার প্রতিধ্বনি করতে আমার এই লেখা। তাদের উঁচিয়ে ধরা প্ল্যাকার্ডের স্লোগান পড়ে আমি এতটাই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ি যে আমার চোখে পানি চলে আসে। আমার সাহসী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পুলিশের উদ্দেশে প্ল্যাকার্ডে লিখেছে, ‘মাথায় গুলি করেন, সেখানে মেধা আছে। মেধা মরে যাবে। বুকে গুলি করবেন না, সেখানে বঙ্গবন্ধু ঘুমিয়ে আছে। সে জাগলে সব ধ্বংস হয়ে যাবে।’

হে জামায়াতি কবি, চোখ মেলে দেখো, আমার সোনার ছেলেরা কী লিখেছে? তারা বঙ্গবন্ধুকে অন্তরে ধারণ করে রেখেছে। তারা স্বার্থ আদায়ের জন্য লোকদেখানো স্লোগান দেয় না। তারা আরো লিখেছে, ‘তোমাদের কাছে মানুষ হত্যার অস্ত্র আছে। আমাদের কাছে মানুষ তৈরির অস্ত্র আছে।’

হে প্রিয় সন্তানরা, তোমাদের কাছে আরো একটি বিনীত অনুরোধ, তোমরা অনলাইন নামক ভূতুড়ে সংবাদ দেখে বিভ্রান্ত হবে না। ওরা তোমাদের অর্জনকে নিজেদের দখলে নেওয়ার জন্য নানা রকম ছলচাতুরী করবে। এটা তাদের পুরনো অভ্যাস। কখনো তারা ধর্মের জিগির তুলবে। কখনো মিথ্যা খবর দিয়ে তোমাদের ভুল পথে নিয়ে যাবে। এরই মধ্যে তোমাদের কাঁধে ভর দিয়ে কেউ কেউ সরকারের পদত্যাগ দাবি করে বসেছে। ঘোলাজলের ওই মাছশিকারিদের সম্পর্কে তোমাদের সতর্ক করতে আমার এই অনুরোধ। তারা এরই মধ্যে খানিকটা সফল হয়েছে। তারা তোমাদের দিয়ে অশ্লীল কথা প্ল্যাকার্ডে লিখিয়ে হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। অনেক তরুণ বুদ্ধিজীবী এই গালিকে সমর্থন করে নানা যুক্তি তুলে ধরছে। তারা বলছে, ‘এটা আন্দোলনের ভাষা, অশ্লীল নয়। এই ভাষার মধ্যে বারুদ আছে।’

না। মিথ্যা। অশ্লীলতার মধ্যে বারুদ নেই। আন্দোলনের বারুদ থাকে বুকে। ভাষায় নয়। আমরা ভবিষ্যৎ বংশধরদের উন্নত ভাষায় শিক্ষিত করতে চাই। যে ভাষার জন্য বুকের রক্ত দিয়ে গেছে আমাদের পূর্বসূরিরা। আমরা কি তাদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি করতে পারি?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, যে মন্ত্রীর জন্য এত কিছু ঘটছে, তার ব্যাপারে আপনার ভূমিকা স্পষ্ট হওয়া দরকার। যে মানুষটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরিবহন শ্রমিকদের লেলিয়ে দিয়ে দেশ অচল করে দেয়, তাকে কোন যুক্তিতে এখনো মন্ত্রিসভায় রেখেছেন, আমরা বুঝতে পারি না।

আমি মনে মনে অনেক দিন ভেবেছি, আমি সরকারপ্রধান হলে কী করতাম? এক মুহূর্তে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ‘বরখাস্ত।’ এ জন্য আমি হয়তো সরকারপ্রধান নই। রাষ্ট্র পরিচালনা করতে অনেক সময় জোড়াতালি দিতে হয়। আপনাকেও দিতে হচ্ছে। কিন্তু এমন মানুষকে আমরা চাই না। যে মানুষ আপনার সরকারকে বিব্রত করে নিজের অপকর্ম ঢাকতে চায়। যে মানুষ আমার সন্তানের মৃত্যু নিয়ে তামাশা করে।      

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার এখন সরব হওয়ার সময় এসেছে। এখন আপনি পারেন, আমাদের এবং শিশুদের উত্থাপিত সব দাবি মেনে নিয়ে তাদের ক্লাসে ফিরিয়ে আনা এবং দেশবাসীকে স্বস্তি দেওয়া। না হলে পরাজিত শত্রুরা লাটাই হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, গল্পকার, টিভি নাট্যকার

 






নামাজের সময়সূচি

বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০১৯
ফজর ৪:২৬
জোহর ১১:৫৬
আসর ৪:৪১
মাগরিব ৬:০৯
ইশা ৭:২০
সূর্যাস্ত : ৬:০৯সূর্যোদয় : ৫:৪৩